" তোমাদের চরণ চুমি"


" তোমাদের চরণ চুমি"

–-----------------------------------

আকাশে বরুণে দূর স্ফটিক ফেনায়

ছড়ানো তোমার প্রিয় নাম,

তোমার পায়ের পাতা সবখানে পাতা

কোনখানে রাখবো প্রণাম” ।

দীনেশ দাসের "প্রণাম” কবিতার কিয়দংশ হাটবোয়ালিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মান্যবর শিক্ষকবৃন্দের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করছি । শুরুতেই বিদ্যালয়ের পাশে কার্তিক নিমাই এর দোকানের গুড়ের খুরমা চিনির কদমা ,ছানার সন্দেসশের কথা স্বরণ করছি,  ওদিকে সমীর চাচার ডুবো তেলে ভাজা ছোট ছোট মুচমুচে সিঙ্গাড়া আর জলিল চাচার মিষ্টি চানাচুর আমাদের মত ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মনে যে প্রবল আগ্রহ ও উদগ্র উৎসাহ তৈরি করেছিল তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই এই তত্ত্ব প্রকাশ করছি। এততদৃষ্টান্তে কয়েক মাইল কাদাপানির পথ উতরে খালি পায়ে ক্ষুদে শিক্ষার্থী যারা এই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন তাদের মনে যে বিদ্যাশিক্ষার প্রতি অতি উৎসাহ দানা বেঁধেছিল সে কথা হলফ করে বলা দুষ্কর। বিদ্যালয়ে অধুনালুপ্ত দক্ষিণ দুয়ারী কানেস্তারা টিনের দালানটিতে আমাদের ঠায় হয়েছিল। আর এই ভবনেই  বিজ্ঞানী সক্রেটিস, অ্যারিস্টটল, স্যার আইজাক নিউটন, গ্যালিলিও,আলবার্ট আইনস্টাইন , চার্লস ডারউইন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি অটোহান, নিকোলো টেসলা, জেমস ক্লাক্স ম্যাক্সওয়েল  অবশেষে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে সাক্ষাৎ  সংসর্গ লাভ করে শিক্ষা ও দীক্ষা গ্রহণের সুযোগ প্রাপ্ত হয়েছিলাম আমরা। জানি দেশে দেশে কালে কালে ক্ষণজন্মা মহাপুরুষগণ আর জায়গা না পেয়ে আমাদের তেচালা কানেস্তারা ঢেউটিনের ঘরে  কিভাবে প্রবিষ্ট হলো এমনধারা প্রশ্ন সকালের মস্তিষ্কে দলাবেধে উঠবে। প্রয়াত হেডস্যার

মনোয়ারুল হুদা, আনিস স্যার, সিরাজ স্যার,মুছা করিম স্যার,আসাদুজ্জামান স্যার, আমার প্রিয় শিক্ষকগণ আমার শিশুদৃষ্টিতে ক্ষণজন্মা মাননীয়  বিজ্ঞানী মহোদয়গণ।  কয়েকজন ভাই বোন মিলে এক কেরোসিন  হারিকেনের আলো-আঁধারি নিয়ে প্রাত্যহিক ঝগড়া শেষে রাতজেগে বাড়ির পাঠ সু-সম্পন্ন করার মতন বদ অভ্যাস আমাদের অনেকের মধ্যে তখনো  গড়ে ওঠেনি তবুও ঘটে গেল এক মজার ব্যাপার! সমবয়সী সতীর্থ যারা অন্য বিদ্যালয় লেখাপড়া করতো তাদের মধ্যে একজন দেখেছিলাম পরীক্ষার খাতায় লিখেছে “ শেরশাহ প্রথম  ঘোড়ার ডাকের প্রচলন করেন” এমনতর সব হাস্যকর বয়ান। আমরা কিন্তু ইতোমধ্যেই জেনে গিয়েছি ভারতবর্ষে শের শাহের আমলে তিনি ঘোড়ার গাড়িতে করে ডাকের আদান-প্রদান প্রবর্তন করেন। তাছাড়াও আমাদের জানা হয়ে গেছে বক্সারের যুদ্ধে মীর কাসিম কেমনতর হারটাই না হারলেন, পানিপথে ইব্রাহিম লোদী কিভাবে বাবর এর কাছে কাবু হলেন কিংবা বল্লাল সেন কখন,কেন ও কিভানে কৌলিণ্য প্রথা প্রনয়ণ করেছিলেন বা  সিলকরোড কেন গড়ে উঠেছিল ইত্যাকার প্রশ্নাত্তোরাদী । আপনি প্রশ্ন করতে পারেন তোমরা তো কখনো ইতিহাস নামক বল্লা পাঠে ততটা আগ্রহী ছিলেনা,তাহলে কি ভাবে এতসব ব্যুৎপত্তি অর্জন করলে ? প্রশ্নটা প্রজ্ঞ সাধু পুরুষের মতন সনাতন ও যথার্থ । স্কুল পালানো এই আমরা যে ঘুণপোকার মতন  পাঠ্যবই অনুরাগী ছিলাম বিষয়টি অতটা সুবোধ সরলমতি বালকের সুকর্মের মতন সাদাসাপটা   নয়। ইতিহাসে অত সালে  অমুক হ্যান করেছেন তত সালে তমুক ত্যান করেছেন এসব মনেরাখা কিন্তু মুচমুচে সিঙ্গাড়া খাওয়ার মতন উপাদেয় নয়।  আমার মতন নাদান নালায়েক ছাত্রও ইতিহাসের এইসব কাঠিণ্য ভেদ করতে সক্ষম হয়েছিলো। আর এইসব অসম্ভব  সম্ভব হয়েছিল আমাদের প্রিয় হেডস্যার মনোয়ারুল হুদার কল্যাণে। আহা ফর্সা চেহারার দরাজ দিলের মিহি কন্ঠের এই মানুষটার কথা মনে পড়লে আমাদের চোখগুলো আদ্র হয়ে ওঠে এবং  প্রশ্বাস প্রলম্বিত হয়। তিনি যখন জিহ্বাকে ঘনঘন এদিক ওদিকে সঞ্চালিত করে ইতিহাস পড়াতেন বিশ্বাস করুন আমাদের তখন আর বইকাটা  কিট হওয়ার দরকার পড়তো না। তিনি সিলেবাসের তোয়াক্কা না করে ঘটনার আগে মাঝে শেষে সব কথাগুলো একেবারে কেচ্ছার মতো করে বলতেন । স্যার যখন ঐতিহাসিক চিত্র গুলো তুলে ধরতেন তখন মনে হত যেন অকুস্থল  থেকে তিনি ঘটনা প্রবাহ  চাক্ষুষভাবে অবলোকন করে জিহবার একটা সুইচে চাপ দিয়ে  লাইভ ইতিহাস সম্প্রচার করছেন । অতুলনীয় এই ইতিহাস পাঠ যা ভোলার নয়। আমি যদি কোন জ্ঞানী-দার্শনিক হতাম তাহলে আমাদের হেডস্যারের এই পুণ্যস্মৃতির উদ্দ্যেশে একটি আপ্তবাক্য লিখে যেতাম তা হলো “ একজন যোগ্য   ও আন্তরীক শিক্ষক অর্বুদ সংখ্যক পাঠ্য বইয়ের চাইতে শ্রেয়”।

বিদ্যালয়ে জাতীয় দিনগুলো উদযাপনের কথা মনে পড়লে আজও  অম্লান চিরচেনা ড্রামের সেই দ্রিম দ্রিম শব্দ  বুকের মধ্যে বেজে উঠে।বাতাসে উড়ন্ত রংবেরঙের পতাকা গুলোর সাথে শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দু শিহরিত স্পন্দিত হওয়ার অনুভূতি মনে পড়ে। আজও কোথাও যখন মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনি তখন মানসপটে দুজন চিত্র ফুটে উঠে একজন হলো  

মহা নায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর অপরজন কবিতায় বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরা আমার প্রিয় শিক্ষক আবুল কাশেম স্যারের মুখোচ্ছবি। 

ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক যখন পিতা-পুত্রের মতন হয় তখন বিজ্ঞানের মত সুকঠিন সুত্র গুলো সহজ সাধ্য হয়ে ওঠে তার সাক্ষাৎ প্রমাণ আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষক জনাব আনিস স্যার। আমি জানিনা সে সময়ে আনিস স্যারের সংস্পর্শ লাভ না করলে এ বিদ্যালয়ের কজন শিক্ষার্থী বিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষার সিঁড়িতে পা রাখতে পারতেন। তদানিন্তন সময়ে এই বিদ্যালয়ে সিরাজ স্যারের অবদান তুলে ধরার জন্যে যথার্থ বাক্য খুজে না পেয়ে নিম্নোক্ত কবিতার আশ্রয় না নেওয়ার গত্যন্তর পেলাম নাঃ

 রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম, ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম । পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি, মুর্ত্তি ভাবে আমি দেব,—হাসে অন্তর্যামী।।

এই জঞ্জাল লেখার কলেবর বৃদ্ধি রোধ ও অধিক স্থান সংকুলান না হওয়ায় আমার যে সকল শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণের নাম নিতে পারিনি তাদের স্থান মনের মনিকুঠায় হিরের বাক্সে রয়ে গেল। 




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি