পথের পাঠ
ত্রিশালের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেনীর ছাত্রদের বেঞ্চের প্রথম সারির একজন নিরব ছাত্রের দৃষ্টি জানালা অতিক্রম করে শ্রেনীকক্ষের বাইরে নিবদ্ধ থাকতে দেখে শ্রেনী- শিক্ষক মহাশয় রেগেমেগে রীতিমত অগ্নিশর্মা বনেগেলেন।
পটল চেরা চোখ,মাথায় একরাশ চুলের বোঝা,জীর্ন কাপড় পরিহিত উদাসীন ছাত্রের পাশে শিক্ষক উপস্থিত হয়ে যখন ছাত্রটির উদ্দ্যেশ্যে বললেন, এই যে বাউন্ডুলে ,তোমার কী শ্রেনী কক্ষের ভীতর দেখার বা শোনার কিছু অবশিষ্ট নেই?
ভাবলেশহীন কণ্ঠে ছেলেটি বলল,স্যার আকাশে একঝাক শকুণ উড়ছে!
শিক্ষক বললেন ,"সগোত্রের দিকে দৃষ্টি রাখছো বোধহয়?"
ছাত্রটি ভরাট গলায় বল্ল,"স্যার ,শকুনের দৃষ্টি ভাগাড়ে আর আমি চেয়ে ছিলাম আকাশের দিকে"
শিক্ষক মহাশয় শ্লেষ মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠলো," আজকের বাড়ীর কাজ গরুর রচনার প্রথম আটলাইন, মুখস্ত করতে পেরেছ কী বাউন্ডুলে?
চকিত কণ্ঠে ছাত্রটি বল্ল ,"স্যার , মুখস্ত করার সময় মেলেনি,দোকানে কাজ করি, পড়ার সময় পাইনা"।
রচনা মুখস্থ হয় নাই মর্মে অবগত হয়ে শিক্ষকের চোখ চড়কগাছে,মখগহবর রসগোল্লার ন্যায় পুরাবৃত্ত হয়ে ছড়ি হাতে ছাত্রটিকে চাবকানোর জন্য তিনি প্রবৃত্ত হলেন।
সহসা বর্ণিত ছাত্রটি অপ্রত্যাশিত ভাবে শিক্ষক কে বেত্রাঘাত নিবৃত্ত করে জানতে চাইল
স্যার, রচনা অর্থ কী?
শিক্ষক বললেন, সপ্তম শ্রেণীতে উর্ত্তীণ হয়ে তৃতীয় শ্রেণীর অবান্তর প্রশ্ন বেটা? রচনা হলো গিয়ে কিছু সৃষ্টি করা মানে তৈরি করা,বুঝেছ বকলম?
ছাত্রটি সময় ক্ষেপন না করে বল্ল, স্যার রচনা অর্থ যদি তৈরি হয় তাহলে তা মুখস্ত করার পিছে এত উঠে পড়ে লাগা কেন স্যার? বানিয়ে বানিয়ে কিছু লিখে দিলেই তো হলো।
শিক্ষক বললেন,”পারলে তা করে দেখাও”।
ছাত্রটি বলল,স্যার সকলেই গরুর রচনা লিখে,আমি গোবেচারি কে অধিক ঘাটাতে চাইনা, অনুমতি দিলে আমি আকাশচারী পাখি বিশেষ নিয়ে রচনা লিখতে চাই।
"হ্যাঁ হ্যাঁ তাহলে ঐ শকুন নিয়েই লেখ",শিক্ষক বললেন।
আসলে গল্পের শিক্ষক মহাশয় অন্যান্য সাধারণ শিক্ষকের ন্যায় গোকুলের প্রতি বিশেষ প্রীতি পোষণ করেন। শকুনির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া ছাত্র যদি সেই গোত্রের হয়,তাহলে গরুর রচনা রচতে দেওয়া শিক্ষকের গব্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠানো কোন সভ্যলোকের কর্ম নয় তাই বিষয়টি এখানেই ধামাচাপা দেওয়া গেলো ।
ত্যাদোড় প্রকৃতির ছাত্রটি বল্ল,"স্যার রচনা লিখবো গদ্যে না পদ্যে?"
শিক্ষক বললেন পদ্যে রচনা একথা তো তিনজন্মে শুনিনি বাপু,"ঠিক আছে, তুমি না হয় পদ্যেই রচনা লেখ"।
তাইতো, গল্প পদ্যে লেখলে তা যদি কাব্য হয় রচনা পদ্যে হলে শিক্ষকের শিরোপিড়ার সঙ্গত কারন থাকেনা।
নাছোড় ছাত্রটি পুনরায় বল্ল,স্যার এটা কী ইংরেজিতে লিখবো নাকী বাংলা ভাষায়?
ধৈর্য্য শক্তি বলবান করে শিক্ষক মহাশয় বললেন,দেখি তুমি না হয় ইংরেজিতেই লেখ"।
ছাত্রটি গভীর মনোযোগ সহযোগে ভালচার বা শকুনের উপর ইংরেজিতে রচনা লিখতে লাগলো।
ইতোমধ্যে সপ্তম শ্রেণীর এ-ই শকুনি কাণ্ড বিদ্যালয় জুড়ে রটে গেল। এ-র সুবাদে শ্রেণিকক্ষে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক সহ সহকারী শিক্ষকদের আগমন ঘটলো।
ছাত্রের লেখা শেষ হলে প্রধান শিক্ষক অবজ্ঞাভরে ইংরেজিতে লিখিত ভালচার রচনা মূল্যায়নে মনোযোগী হয়ে উঠলেন।
সে ইংরেজিতে লিখেছে
ভালচার,সাধারণত এরা অসুস্থ ও মৃতপ্রায় প্রাণীর চারিদিকে উড়তে থাকে এবং প্রাণীটির মরার জন্য অপেক্ষা করে। পাখিগুলো কুৎসিত হলেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টির অধিকারী। আজকের দিনে মৃত্যু প্রায় প্রাণীদেরকে সুসভ্য মানবেরা আহার করে বলে মানব খাদ্য এমন প্রাণীর মৃত্যু সাধারণত হয়না কারণ শকুনের গ্রাস কেড়ে নিয়ে মানুষেরা ভক্ষণ করে বলে খাদ্যাভাবে এ-ই পাখিদের ব্বংশ রক্ষা একপ্রকার হুমকির মুখে পড়েছে,,,,,,,
এইরূপ রচনা পাঠ্যদ্ধার করে প্রধান শিক্ষক ছাত্রটির প্রশংসায় কি বলবেন তার ভাষ খুজে পেলেন না।শ্রেনী শিক্ষকও ভিমরি খেলেন। অন্যান্য শিক্ষক মন্ডলীরা পো পো করে যে যার মত ছাত্রটির সংকীর্তন করলেন।ছাত্র ছাত্রীদের মাঝেও বাউন্ডুলে ছাত্রটির সুনাম সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো কিন্তু পরের দিন স্কুলের চৌহদ্দিতে তার দেখা মিললো না। যার পাঠশালা জগৎময় তাকে কী আর স্কুলের খাটো খুপরিতে আটকিয়ে রাখা সম্ভব হয়।তাই সে বেরিয়ে পড়লো পৃথিবীর পথে।
বেশ কয়েক যুগ পরে চাউর হলো স্কুল পালাতক শিশুটি আর কেউ নন তিনি আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন