গৃহগোধিকা
মোঃ মুস্তাফিজুর রহমান।
+++++++++++++++
বিশেষ
কৃতিত্বের সাথে এমএ পাস জুটলেও বছর সাতেক অশেষ পেরেশান ও হন্যে হয়ে খুঁজেও চাকরি নামক রত্ন পাথরের সন্ধান মিলল না । কাহাতক
বাপের ভোজনালযয়ের অন্ন ধ্বংস করা যায়?এসব বিস্তর ভেবেচিন্তে ইদ্রিস আলী অনন্যপায়
হয়ে ভুঁইফোড় হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার বনে গেলেন। অশেষ মহাকাশের যেমন মূড়োমাথা থাকে না তেমনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মূড়োমাথা খুঁজে না পেয়ে মাত্র গোটা কতকদিন মেটেরিয়া মেডিকায় চোখ বুলিয়ে হাতামাতা না জেনে
লেজের দিক থেকে শুরুকরে রীতিসিদ্ধ লোকমান্য ডাক্তার মহাশয় এর তকমা অর্জন করে বসলেন।দুই বছরেই ইদ্রিস
আলীর রবরবা পড়ে গেল বিশগ্রামে। সে সুবাদে
বান্ডিল বান্ডিল অর্থ কুণ্ডলী পাকালো তার ক্যাশ বাক্সে।সলিমুদ্দিন নামে
আইএ পাশ মাছি মারা কেরানি গোছের কম্পাউন্ড
হিসেবে তার চেম্বার জুটে গেল পাশের গাঁয়ের এক ছোকরা। বছর দুই যেতে না যেতেই না যেতেই
ইদ্রিস আলী পুরাদস্তুর রূপান্তরিত হলেন ডাক্তার ইআলী নামে ।এটা প্রথা সিদ্ধ অন্যান্য বিখ্যাত ডাক্তারদের
নামকরণের একটি ধারা মাত্র ,এতে বিচলিত হওয়ার বিশেষ কারণ নেই। ডাক্তারির সাথে সাথে রাত বিরেতে বহু পড়াশোনা করে একটা বাজখাই মোটা ধাপড়া টাইপের কাগজের সনদপত্র ও
তারহাতে মিলে গেল অবশেষে।
ডক্টর ইআলি একটু ভোলানাথ টাইপের লোক, তাকে নিয়ে আপাতত কেউ বিদ্রুপ করার হীন মানসিকতা পোষণ করবেননা কারণ হিন্দু
ধর্মের একজন অন্যতম দেবতা মহামান্য শিব ,তিনিও
কিন্তু আত্মভোলাএকটা দেবতা। সুতরাং আলীর মধ্যে
হিন্দু ধর্মের অধিকারী শিবের এই বিশেষ গুণাবলী প্রবল ও
প্রকট হয়ে উঠলো তখন থেকে ডাক্তার হিসেবে আলীর নাম আন্তঃনগর ট্রেনের বেগে ছুটে
চলল। নজরুল বলেছেন যতই পড়িবে ততই ভুলিবে আর যতই ভুলিবে ততই শিখিবে এই মন্ত্র ডাক্তারির
ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়ে পডল। প্রথিতযশা অর্থাৎ
যার খ্যাতি যশ একেবারে পুঁতেগেছে সেই বট বৃক্ষের
মধ্যে আলী যতই ভুলে যেতে থাকলেন ততই তার সুনাম-সুখ্যাতি দূর থেকে দূরান্তে মহাকাশের
নক্ষত্রলোকের মতো ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। লোকেরা
বলে থাকেন হোমিওপ্যাথিক নাকি রোগের চিকিৎসা নয় এটি রোগীর চিকিৎসা পদ্ধতি। যত ঊনো ততো দুনো সেহিসেবে
বর্ণিত ঔষধের ঘনত্ব যত কম, মান তত পইপই করে বৃদ্ধি পায় সে সূত্রে হোমিও চিকিৎসকের
ধী ও মেধাশক্তির যতই খামতির দিকে নামে ততোই নাকি বর্ণিত ডাক্তারের রোগ সারানোর ক্ষমতা
সুতীক্ষ্ণ হয়। আপনি হয়তো ইতোমধ্যে লক্ষ্য করে থাকবেন অধিকাংশ হোমিওপ্যাথি ডাক্তার
তারা হয় ধার্মিক না হয়
নিদেনপক্ষে দার্শনিক টাইপের। অতি সাবধানে
লক্ষ্য করলে দেখবেন হোমিও ডাক্তার বেশিরভাগেরই কারো মাথায় লম্বা টুপি অথবা অন্যান্য
ধর্মের সব লক্ষণাদি পুরাপুরি বিদ্যমান রয়েছে।
ইসলাম ধর্মে সরবান তাহুরা বেহেশতে অনুমোদিত হলেও এ পৃথিবীতে তা নিষিদ্ধ হিসেবে বিবেচিত
হয়েছে কিন্তু বেশিরভাগ হোমিওপ্যাথিক ঔষধ অ্যালকোহলযুক্ত , তার পরেও জীবন রক্ষার্থে নাচার এর কোন মাসালা নাই এজাতীয় নানাবিধ ফুকোদার্শনিকতারউপর ভিত্তি করে হোমিও চিকিৎসা পদ্ধতিকে
শুধু ইসলাম সমর্থিত ও স্বীকৃতি বলেই তারা বিবেচনা
করে না বরং এটা ইসলাম ধর্মের চিকিৎসা পদ্ধতির সাথে মিলে যাওয়ার বিষয়ে তারা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে থাকে। আর পাঁচটি হোমিও
চিকিৎসক এর ন্যায় ডাক্তার আলী লেখালেখির কাজে
মগ্ন থাকেন।এই লেখালেখি তাকে সমাজের সমাজদার ও কর্ণধার হওয়ার বিশেষ একটি
মাধ্যম ও সোপান হিসেবে পৌছে দিবেন এ বিশ্বাসে তিনি আস্থা স্থাপন করেন । এই ডক্টর আলীর
অপর একটি বৈশিষ্ট্য হলো তিনি সদাই সরকারি দলের রাজনীতির সাথে জড়িত থাকেন। সরকারি দলের
রাজনীতির সাথে জড়িত থাকার অসংখ্য সুফল এরমধ্যে
অন্যতম হলো স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের পদ-পদবী পাওয়া সহজতর হয়। ডঃ সাহেবের
এই ধারণা যে অবান্তর বা অযাচিত নয় তা প্রমাণিত হয়ে গেল যখন তিনি স্থানীয় একটি কলেজে
সভাপতির উষ্ণ আসনটি উপভোগ করার সুযোগ পেয়ে গেলেন ।
বেশিরভাগ সময়ই আলী লেখালেখির কাজে সময় দেন,
অনেক সময় চেম্বারে রোগীর ভিড় জমে যুগপৎ তার লেখনীর রাজ্যে বিশেষ কোনো ভাবের উদয়
হয় তখন তিনি লেখনিকেই বিশেষ ও যথাযথ প্রাধান্য দেন। কারণ রোগী গেলে ফিরবে মাগার ভাবের ছন্দপতন হলে তা মাঠে মারা পড়বে এটা
নিশ্চিত। ডাক্তার চেম্বার এর মধ্যে লিখছেন। চিন্তা রাজ্যে বিশেষ ভাবের উদয় হয়েছে।
ইতোমধ্যে কম্পাউন্ডার সলিমুদ্দিন এসে বললেন স্যার রোগী তো গোটা বিশেক এসে জটলা পাকিয়েছে
ওদের কি দেখবেন?
ধৈর্য ধরে বসতে বল, যাদের মনে ধৈর্য্য নেই
তারা যেন আমার চেম্বারে না আসে। রোগ সারাতে চায় কিন্তু রোগীর মনে ধৈর্য নাই এত বড়
বহুৎ বুরাহ সমাচার!
সত্যিই তো কে আলী নামক একজন হোমিওপ্যাথিক
চিকিৎসক এক আঁচিলধারিরোগীর ঐ অর্বুদ খসাতে চুয়াল্লিশ বছর ছয়মাস সময় নিয়েছিলেন।
ডাক্তার সাহেবের চেম্বারে একটা উক্তি স্পষ্টাক্ষরে
লেখা আছে। বেন্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন, আমেরিকান বিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদ তিনি বলছেন,“যার ধৈর্য আছে, তার
চাওয়া একদিন পূরণ হবেই “।
এক দুই চার আট এভাবেই জ্যামিতিক ধারায় রোগীর
সংখ্যা বাড়তে বাড়তে অবশেষে জনা পঞ্চাশেক
রোগী জুটে গেল এবং তারা রীতিমতো গগোল বাঁধানো আরম্ভ করলো ।রোগীদের লাইনের সামনে
চাঁদিতে চুল নেই ষাট উত্তীর্ণ এক ব্যক্তির
নাতনির পেটে বায়ু জমেছে সাথে শুলও আছে,তারপরের
জনের জল উদরী এবং তার পিছের লোকটির প্লীহা বেড়েছে,তার পিছনের লোকটির ঘাড়ের অর্বুদ
বাড়তে বাড়তে বগলের কাছে এসে ঠেকেছে। ভিন্ন
ভিন্ন রোগে ভোগা লোকেরা কাহিল হয়ে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। নানা রোগে আক্রান্ত
বিভিন্ন রোগীর মুখ থেকে নির্গত আর্তনাদ হোমিও
ডাক্তারের চেম্বার কে কাঁপিয়ে দিয়েছে ।ডাক্তার ই আলী তার হোমিও ল্যাবরেটরি তে ব্যস্ত
আছেন, পেল্লায় গোটা দশেক আলমিরার
মধ্যে হাজার হাজার ওষুধের শিশি গুলো বুক টনটন
করে সগর্বে সৈনিকের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সাথে সংযুক্ত হয়েছে অ্যালকোহলের অবিমিশ্র গন্ধ, পেট মোটা বড় বড় গ্লোবিন এর প্যাকে্ট, পেষিত চিনি দানার পিষিত পাউডার,অযুত
নিযুত শিশি ও ছিপি।ঔষুধের শিশির মধ্যে মাদার টিংচার ঢেলে অ্যালকোহল মিশিয়ে শিশি পুরে
কর্ক দিয়ে আটকিয়ে ঝাকাঝাকির এর কায়কারবার। এই গবেষণাগারের মহত্ব ও শ্রী বৃদ্ধি করেছে
পাঁচ পাঁচটি টিকটিকি, সাধু বাংলায় যাদেরকে বলে গৃহগোধিকা। ইসলাম ধর্মে মানুষ জাতির
উপর টিকটিকি বাবগৃহগোধিকা তেমন কোনো ভূমিকা নেই কিন্তু সনাতন ধর্মের মতে এই গৃহগোধিকানামক
অসাধ্যসাধন কারি প্রাণীগুলো মানুষের জীবন মৃত্যু ভাগ্য অসুখ-বিসুখস মস্ত কিছুর ওপর
বিশেষ ও অসাধারণ ভূমিকা রাখে ।
টিকটিকি টিকটিক করে আওয়াজ করলো তারমানে আপনি
যা ভাবছেন বা
বলছেন তা যথার্থ হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে,
বর্ণিত গৃহগোধিকা যদি আপনার ডান কাঁধে পতিত হয় তাহলে আপনার আয়ু বৃদ্ধির
সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে আর যদি বাম ঘাড়ের
উপরে পতিত হয় তাহলে ঘাড় মটকে যাওয়ার আশু সম্ভাবনা
আপনাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে এই জীবনে
অনেক অহেতুক ভার বইতে হবে এটা যদি ডান পায়ে পড়ে তাহলে অর্থাগমের সম্ভাবনা বাম পায়ে
পতিত হলে
স চলার পথে বিপথে পা হড়কিয়ে খাদে পতিত হওয়র
সম্ভাবনা ঘনীভূত হবে।এইপ্রাণিটি নানা
বিধ সম্ভাবনা ও আশঙ্কার মূল চালিকা শক্তি।গৃহগোধিকার মুখ ও ওষ্ঠ নিঃসৃত বিভিন্ন শব্দাবলীর
সাথে সঙ্গতি রেখে হোমিও যত প্রকারেররেপার্টরি আছে তার সাথে সংগতি বিধান করেরোগীর ব্যবস্থাপত্র
প্রদান করে থাকেন্। প্রসঙ্গক্রমে একথা বলে রাখা ভালো যে সকল টিকটিকি কিন্তু টিকটিক
আওয়াজ করে না তাদেরমুখস্থনির্ভর
ধ্বনি গুলো কখনো ক চ ট ত প বর্গ থেকে উদগত
হয় কিন্তু মানুষ সমাজের মধ্যে
একটা অতিশয় ভ্রান্ত বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে শুধু
টিকটিকি টিকটিকি করে অন্য কোন শব্দ করতে সমর্থ
নয় এটা যে একটা ভ্রান্ত ধারণা এই মহতী
ডাক্তার ইতোমধ্যে শনাক্ত করে ফেলেছেন। একথা
কিঞ্চিত বলে রাখা ভালো যে সকল টিকটিকি টিকটিক আওয়াজ করে না।গৃহগোধিকা শুধুমাত্র টিকটিক
শব্দ করেন এই মতের সাথে আলী সাহেব পরিপূর্ণ বিপরীত পোষণ করেন তিনি একথা অন্তরের অন্তস্থল
থেকে বিশ্বাস করেন যে টিকটিকি বা গৃহগোধিকা টিকটিক ছাড়াও
আরও বিভিন্ন প্রকার শব্দ উচ্চারণ করতে পারেন
যেমন চিকচিক ঠিক ঠিক লিক লিক ধিক ধিক ইত্যাদির বাংলা বর্ণমালার উচ্চারিত অন্যান্য ধ্বনি
সমূহ।টিকটিকির ইংরেজি শব্দ হচ্ছে gecko গেকো।এতে প্রমাণিত হয় ইংরেজরা টিকটিকির ডাক
টিকটিক শোনেন না তারা শুনেন গেক গেক।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা হচ্ছে রোগীর চিকিৎসা তাই রোগীর লক্ষণ উপসর্গ ভালো লাগা খারাপ লাগা সাথে
সঙ্গতি বিধান করে ডাক্তার সাহেবের ল্যাবরেটরীতে পোষা পাঁচ-পাঁচটি গৃহগোধিকার বিশেষ
সাহায্য নিয়ে থাকেন । একই লক্ষণের একাধিক ঔষধ রয়েছে ডাক্তার সাহেব বোনের মধ্যে সম্ভাব্য
সকল ঔষধ গুলো আওড়িয়ে নেই অতঃপর দেয়ালেও ছাদে বিচরণশীল গৃহগোধিকা অনুসরণ করেন তাদের
উচ্চারিত শব্দ ধনীর সাথে যে ঔষধ এর নাম মিলে যায়
রোগীদের ক্ষেত্রে সাধারণত সেই সকল ঔষধ প্রদান করেন।
চানদিতে চুল নেই যে রোগীর নাতনির পেটে বায়ু
জমে ছিল সাথে শুলও ছিল তিনি যখন গৃহগোধিকা প্রদত্ত নাক্স ভোম বেলেডোনা নিয়ে ঘরে ফিরেছেন
ততক্ষনে নাতনির পেটের বায়ু যে কোন পথে বেরিয়ে গেছে, শুল ও রীতিমতো কমে গেছে।জল উদুরি রোগীর তীক্ষ্ণ তীব্র যন্ত্রণায় তাড়িত হয়ে একটা
চটি পায়ে চটাং চটাং করে ডাক্তারের চেম্বারে প্রবেশ করলেন। হাটুরে এইসব রোগীদের সাধারণ সৌজন্যতা বোধের অভাব
ও অভদ্রতার পরাকাষ্ঠা দৃষ্টে ডাক্তার একপ্রকার
খাপ্পাহয়ে গেলেন। এই রোগ কেমন করে বাঁধলেন মশাই এই জাতীয় প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা ডাক্তারি
শাস্ত্রের বারণ আছে, তবুও চটি পায়ে উদ্ধত্য
ভরে রোগীর প্রবেশ ডাক্তারের মনে গভীর ক্ষোভ জন্ম নিয়েছিলতাহা দ্বারা তাড়িত হয়ে ডাক্তার
রোগী কি বললেন তোমার উদর যে আস্তে আস্তে একটা বড় আকারের
কটা বড় মাপের কলস বরাবর হয়ে গেছে দেখছি কোথায় পেলেন এই ব্যামো। জল উদারি রোগে কি পরিমাণ ব্যথা
অনুভূত হয় তা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কেউ বুঝতে পারবে না, যেমনটি ডাক্তারি আলী ও বুঝতে
পারলেন না।এটি এতই ব্যথা যে কোন প্রকার রাখবা উষ্মা প্রকাশ করার সময় এটা নয়

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন