কাঁঠালের আমসত্ত্ব

 



মোঃ মুস্তাফিজুর রহমান।

+++++++++++++++++++++++++++++++++

জনাব মোঃ নওয়াজিশ আলী , তিনি অতি সুন্দরী রমণীদের প্রতি বিশেষ  বিদ্বেষ পোষণ করেন জনাব আলী চৌধুরীরএই নারীবিদ্বেষ এর পিছনে একটা ছোট মজার কাহিনী রয়েছে পাঠকের অবগতির জন্য তা নিম্নে বর্ণিত হলোঃ

 

সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপা আর পরীক্ষার হলের আসন বিন্যাস কারী কর্তৃপক্ষের বিন্যাসিত আসন ব্যবস্থায় পার্শ্ববর্তী মেধাবী ছাত্রদের সহযোগিতা ও বিশেষ  সোহবতে  নওয়াজিশ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় একটা বাঘরেসে  ঢাউস ফলাফল অর্জনে সফল হল।উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সফলতার সিকে ছিড়তে পারার গর্বে তার বাবা মায়ের মুখে হাসি ফুটল গ্রামবাসী জানালো বাহবা ধ্বনি সতীর্থ বন্ধুদের মুখে উচ্ছ্বাস দেখা দিল যদিও কারো কারো অন্তর পুড়ে হলো খাক অগ্নিকাণ্ডের পরবর্তী  ছায়ভস্মের মত।

 

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উৎকৃষ্ট ফলাফল অর্জন করা এবং ভালো কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো বিষয়ে নিজের নাম লিখে নিতে পারাটা কিন্তু এক জিনিস নয় ভুক্তভোগী মাত্রই এটা উপলব্ধি করে থাকবেন।  মনে করুন উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো ফলাফল অর্জন করা যদি তাজিংডং পর্বতের সর্বোচ্চ শিখরে  উত্তরণ হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো কোন সাবজেক্টে নিজের নাম লিখে নেয়ার কৃতিত্বটা হিমালয়ের মাউন্ট এভারেস্টের শীর্ষে আরোহনের মতন সুকঠিন কায়কারবার।

 

যাই হোক নওয়াজিশ  মনে করেন বাংলাদেশের একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যেটি মহান সৃষ্টিকর্তা নিজে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে পাখিকুল কে ডেকে এনে থাকেন,নিজ হাতে গাছপালায় চিরহরিৎ রং করেন ,  অতঃপর  ছাত্র ছাত্রীদের মনে বিদ্যার প্রতি প্রবল আকর্ষণ বল সৃষ্টি করে মহাকর্ষীয় বেগে শিক্ষার্থীদের  টেনে চলেছেন, আজ সেই চির কাঙ্ক্ষিত স্বর্গসম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বসার জন্য সে মনস্থির করেছে।

 

এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু বঙ্গজ ছাত্রসমাজের উদ্বেলিত ঢেউ দেখে হয়তো মনে হবে এরা মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্রে লড়তে এসেছে ।দীর্ঘায়িত ছাত্র সারির গতি জড়তাকে গড্ডালিকা প্রবাহ বলা যেতে পারে। ছাত্র স্রোতে গা ভাসিয়ে  অন্যান্য গড্ডলদের মত  নওয়াজিশ আহমেদ তাঁর পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষার আসনে বসে পড়তে সক্ষম হলো।

 

সে যখন মাধ্যমিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছিল তখন সহযোগী মনোভাবাপন্ন মেধাবী ছাত্রদের সহবত লাভে ও মেধাবী  ছাত্রদের আন্তরিক সহযোগিতায় কৃতার্থ হয়েছিল, এইবার যা হতে চলেছে তা অনুরূপ বললে ভুল হবে, বরং ততোধিক উৎকৃষ্ট কিছু। অসীম সম্ভাবনার ভবিতব্য অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে আশু ভর্তিপ্রাপ্ত উজ্জ্বল  সম্ভাবনায়  তার মনে বাজলো বাঁশি সুর, চোখে দেখল আলোর ঝলকানি আর হৃদয় বীণায় বেহালার যে সুর ধ্বণিত হলো কহতব্য নয়।

 

স্বর্গের অপ্সরা দের সৌন্দর্য  নিয়ে আপত্তি তোলার কোন  ফুরসত নেই। কথিত আছে একজন বেহেশতের হুর যদি এই পৃথিবীতে তার মুখ নিঃসৃত থুতু নিক্ষেপ করে তাহলে তার পৃথিবীর দুর্গন্ধ মেশক অম্বরে পরিণত হবে।অবশ্য যারা হাজারীবাগের মনেশ্বর লেনে ট্যানারি  এলাকায় গমন করেছেন কিংবা ভাষানটেকের কালাপানি বস্তির ভিতর দিয়ে যাতায়াত করেছেন তাদের মনে এই প্রশ্ন জেগে উঠতে পারে যে স্বর্গের অপরূপ কোন অপ্সরা কেন কৃপা বশত এসব এলাকায় থুথু নিক্ষেপ করে বাঙালির নাকের ছিদ্র রক্ষা করে না। যাক এসব ব্যাপারে শুধু সৃষ্টিকর্তার হাত মানবজাতির বিশেষ করণীয় নেই তাই  বিষয়টি  এড়িয়ে যাওয়া গেল।

 

বাংলায় খাটাশ নামক একটি প্রাণী আছে যার মলত্যাগ বিশেষভাবে লক্ষণীয় ,একই স্থানে সে নিয়মিত মলত্যাগ করে যতক্ষণ পর্যন্ত তার ত্যাগ কৃত মল তার কাজটি করতে সরাসরি বাধা প্রদান না করে। ভাগ্য নির্ধারণকারী যারা আছেন তারাও ভাগ্য বণ্টনে খাটাশের মলত্যাগের নীতি গ্রহণ করেন।যেমন ধরুন প্রতিরাতে যিনি গো  মাংস, বিরানি কাবাব ইত্যকার সুস্বাদু ও মুখরোচক খাবার খেয়ে নিদ্রা যান অশরীরী ভাগ্য বণ্টনকারীরা বর্ণিত বিত্তশালী ব্যক্তির পরবর্তী বছরে একই ধরনের খাদ্য খাবার ও বাসস্থান বরাদ্দ করেন। অপরপক্ষে যে ভিখিরির দু কাঠা জমি ছিল অশরীরী ভাগ্য বণ্টনকারীদের ইচ্ছায় তাও ঢুকে যায় নদীর পেটে আর ওই ভিখেরীর নাম ওঠে নদী সিকস্তি ব্যক্তিবর্গের নামের টালিখাতায়।

 

 

ভাগ্য বন্টনের হর্তাকর্তারা আবারো উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষার  অনুরূপ ভর্তি পরীক্ষায় উতরে নেওয়ার অভিপ্রায়ে বিশেষ দূত পাঠানোর বন্দোবস্ত করে দিলেন।ভর্তি পরীক্ষায় সাহায্য করার জন্য স্বর্গ থেকে যে অপ্সরা নেমে এসেছিল তার নাম রুমা। রুমা  অতিশয় প্রাণবন্ত স্বগতোক্তি করে বসলো যার অর্থ করলে এরকম দাঁড়ায় যে, ❝আমি ভর্তি পরীক্ষা বিষয়ক বিশারদ ,এখানে সম্ভাব্য যে সকল প্রশ্ন আসতে পারে তার সমুদয় উত্তর আমার জানা রয়েছে ❞ এবং নওয়াজীশ আলী যদি তার সাহায্য প্রার্থনা করে তাহলে সকল প্রশ্নোত্তর  সে বলে দিতে কোন প্রকার কার্পণ্য করবে না।

 

ঢং ঢং ঘন্টা  ধ্বনি  পড়তে পড়তে  ভর্তিচ্ছুদের হাতে প্রশ্নপত্র চলে এলো। আর গল্পের নায়ক মোঃ নওয়াজিশ আলী পাশে বসা রুমার সুন্দর মুখ, রঞ্জিত ঠোঁট বরফ সাদা দাঁত আর নাশপাতির মতো  মুখোঅবয়ব থেকে  আগত সকল প্রশ্নোত্তর খাটাখাট করে উত্তরপত্রে টুকে দিলো পরীক্ষার উত্তরপত্রে। হয়তো এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা প্রবাদের ঢুকে গেছে, ভাগ্যবানের বোঝা ভগবান বহন করেন।ভর্তি পরীক্ষার পাঠ চুকে গেল। এইবার  নওয়াজেশ আহমেদ যার বদৌলতে ভর্তি পরীক্ষার সকল সঠিক প্রশ্ন উত্তর প্রদান করেছেন তাকে কিভাবে ঋণ পরিশোধ  করে প্রতিদান প্রদান করবে সে বিষয়ে বিস্তর চিন্তাভাবনা শুরু করে দিল। পিতৃপ্রদত্ত পথ খরচ ও তার সঙ্গে থাকা তল্পিতল্পা ছাড়া নওয়াজেশ আহমদ এর নিকট দেওয়ার জন্য যা ছিল তা হল একটা অত্যাধুনিক মুঠোফোন, সেটিও অবশ্য ওই পৈতৃক ধন। নওয়াজীশ আলী  এই জিনিসটা প্রাণের মত ভালবাসত। কি আর করার অনন্যপায় হয়ে পরীক্ষার হলে সাহায্যকারী রুমা নামক স্বর্গ থেকে আগত অপ্সরাকে বস্তুটা উপহার হিসেবে দিয়ে দিলো।

আধুনিক মেয়েরা উপহার নিতে কাল বিলম্ব করে না, তেমনি নওয়াজেশ আহমদের মুঠোফোনটা নিতে  দ্বিধা সংকোচ বোধ করলো না, কিন্তু এ ধরনের উপহার দেয়ার জন্য সে  অর্থাৎ রুমা ধন্যবাদ জানানোর জন্য যেসব সাবলীল ও প্রচলিত ধ্বনি ও শব্দ রয়েছে তা প্রয়োগ করল।প্রিয় মালটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ায়  নোয়াজেশ এর বুকের মধ্যে একটু খচখচ করল  কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায়  উতরে যাওয়ার আশু সম্ভাবনা সে ব্যাথা ভুলে ক্ষতের  উপর কিছুটা আরাম  প্রলেপ টের পেল বটে।

কিছু উপাদেয় খাবার এবং পানীয় গ্রহণের পর নওয়াজীশ আলীর সৌজন্যে আহমেদ এবং রুমা একই বাসে চাপলে আরিচার উদ্দেশ্যে।নওয়াজেশ আহমদ এর পিছনের  লাগোয়া আসনে রুমার আসন  নির্ধারিত হল। বাসের সাইট গ্লাস থেকে রুমাকে পুরাপুরি দেখা সম্ভব হল, অবশ্য সে জন্য  ঘাড় ঘুরিয়ে  সামান্য  কসরত চালতে  হচ্ছিল বটে তথাপিও বাসের উত্তাল গ্লাসের উপর সহযাত্রী রুমার যে মুখশ্রী ফুটে উঠছিল তা অপূর্ব ।যানবাহনের সাইটগ্লাসে সাধারণত লেখা থাকে আয়নায় দৃষ্ট বস্তটি যেমন দেখাচ্ছে তা ততোধিক নিকটে। সে তত্ত্ব মতে রুমা তার চাইতে যত দুরুত্বে বসে আছে প্রকৃত দুরুত্ব তারচাইতে কম।সে একটা সরকারি সুদর্শন প্রাকৃতিক পরিবেশ বেষ্টিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে  আবার তার সাথে সাথে হয়ত চান্স পেয়ে যাবে এই রুমা, তারমানে ঘটনাটা দাঁড়াবে বাংলা সিনেমার মতন ,এইসব চিন্তার গভীরে যখন নওয়াজেশ আহমদ মশগুল হয়ে ডুব সাঁতার কাটছে ঠিক সঙ্গে সঙ্গে তখন গাড়ির চালক দ্রুতগামী গাড়ির ব্রেক ঘ্যাচাং করে কষে দিলেন  অমনি যাত্রীরা নিউটনেরগতি জড়তার সূত্র টের পেল, অবশেষে  নওয়াজেশ আহমদ অবশ্যই  বাসের সাথে ঝাঁকুনি- দুলুনির সাথে সাথে পিছন থেকে আগত একটি স্পষ্ট পদাঘাত তার ডান পায়ের উপর টের পেল,তার বুঝতে অবশিষ্ট থাকল না যে এই কর্মটি নিশ্চয়ই রুমার রসিকতা  ফল।

রাস্তায় ভিড় ও যানজটের সুবাদে এরকম ব্রেক কষার ঘটনা পুনঃ পুনঃ ঘটতে লাগলো। পিছন দিককার পদাঘাতে চলতে লাগলো সমান তালে, পদাঘাতের আনন্দে  মোহাম্মদ  নওয়াজীশ আলী চৌধুরীর মনে যেসব প্রশ্ন দানা বাঁধে সেগুলো অনেকটা এরকম, উত্তরা আধুনিক যুগের মেয়েরা এত ফার্স্ট হয় কিভাবে? এই মেয়েটি নিশ্চয়ই ক্লারা জেটকিন বা তসলিমা নাসরিনের    শিষ্য হবে ।

অপ্সরা রমণীর পদাঘাতে তো কোন আঘাত লাগে না বরং তা  দ্রুতবেগে সময়  ক্ষেপণে সহায়ক হয়  তা বোঝা গেল যখন  নওয়াজীশ আলী কাঙ্ক্ষিত সময়ের পূর্বেই বাসটি আরিচা ঘাটে  পৌঁছে গেল।

লোকের কোলাহলে এবং চিন্তার মায়াজালে কখন যে   তার চোখের নজর বাসের সাইট-গ্লাস থেকে অন্যদিকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে তা সে নিজেই বুঝতে পারেনি, যখন সে সম্বিত ফিরে পেল তখন বাসের উত্তল গ্লাস অনেকটা অবতল হয়ে এসেছে সেখানে কোনো নারী মূর্তি বা অপ্সরার ছবি নেই! এবং এ-ই আয়নায়া নৈক্ট্যের সেই বৈজ্ঞানিকবাণীও নেই, তারমানে আরিচা আসার আগেই সে অর্থাৎ অসাধারণ সুশ্রী সেই মেয়েটা খুলে নিয়েছে এবং অত্যন্ত গভীর ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নওয়াজীশ আলী বুঝতে পারলো যে এতক্ষণ সে রুমার পদাঘাত বলে  অনন্দ লুটেছে  সেটা আদৌ কোন মানুষের পদাঘাত নয় বরং তা বাংলাদেশের জাতীয় ফল এক পেল্লায় কাঁঠালের কাটাঘাত ।

কাঁঠালের কাটাঘাত কে নারীর পদাঘাত ভেবে নওয়াজীশ আলী আনন্দ লাভ করেছিল তা অনতিবিলম্বে আকাশে মিলে গেল। কদিন বাদেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হল।মেধাতালিকা অপেক্ষমান তালিকার কোথাও  তার  রেজিষ্ট্রেশন  নম্বর টি খুঁজে পাওয়া গেল না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন আকাশের দুরের তারা হয়েই রইল। দু-চোখ ভর্তি জলপুর্ন মুখে বায়ুবুদ্বুদের ভীতর উচ্চারিত হলো সালাম জাবি।মনে মনে সে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিশ্চিত কোন ভাল ডিপার্ট্মেন্টের ছাত্র-ছাত্রী হাজিরা খাতায়  নিজের নাম লেখাতে পারার  কারণে অন্য কোথাও সে  ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার দুষ্কর্ম করেনি। সে   এখন মুঠোফোনটা হারিয়ে  পৈত্রিক  জমিতে মেটে আলু মরিচ,কাল-কচু, পেঁয়াজ,কাচা মরিচ ইত্যকার আনাজপাতির চাষ করে  দিনপাত করে।

 

 

 

 


মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

" তোমাদের চরণ চুমি"