==দাওয়াই==
==দাওয়াই==
এই গল্পটা আমাদের বঙ্গদেশীয় নয়, এটা গজিয়ে
উঠেছে বহুদূর ভিনদেশে ।বর্ণিত দেশটাতে দুর্নীতি নামক মচ্ছব ঘন দধির মত জমে উঠেছিল। সেই দেশে পাঁচটি অঙ্গরাজ্য
ছিল।
পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে পাঁচজন কর্ণধর নিয়োগ করা
হলো। প্রথম অঙ্গরাজ্যে যিনি নিয়োগপ্রাপ্ত হলেন তিনি হলেন একজন ইসলামধর্মানুরাগী, কোরআন
কালামে বিজ্ঞ মুমিন ব্যক্তি। দ্বিতীয় অঙ্গরাজ্যে
যিনি নিয়োগপ্রাপ্ত হলেন তিনি অজ্ঞেয়বাদী
। তৃতীয় বাউল মতের একনিষ্ঠ সাধক ও মানবতাবাদী
।চতুর্থ অঙ্গরাজ্যে যিনি নিয়োগপ্রাপ্ত হলেন তিনি প্রাচীন সনাতন ধর্মের অনুসারী একজন
আচারনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ। পঞ্চম অঙ্গরাজ্যের নিয়োগপ্রাপ্ত হলেন তিনি একজন বিজ্ঞানমনস্ক
ব্যক্তিত্ব ।
প্রথম অঙ্গরাজ্যের কর্ণধর কুরআনে হাত রেখে ,
অজ্ঞেয়বাদী নিজের মাথায় ও বুকে হাত রেখে ,
বাউলজন গুরুর উত্তরীয় ধরে ব্রাহ্মণ
ভগবত গীতাছুঁয়ে ,বিজ্ঞানী থেলিসের প্রতিমূর্তি ধারণ করে দ্বায়িত্ব পালনের শপথ
বাক্যের পাঠ করলেন।
বাঘা বাঘা জাদরেল, মান্যগণ্য হর্তাকর্তা নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার সুবাদে দুর্নীতি
নামক মহামারী দূর হবে মর্মে লোকেদের মনে বিশ্বাস
স্থাপিত হলো। কিন্তু বিধিবাম, বছর ঘুরতে না ঘুরতেই প্রত্যেক অঙ্গরাজ্যের দুর্নীতি আগের
চাইতে বহুগুনে বেড়ে গেল। কুরআন-কিতাব, ভগবত গীতা, দর্শনশাস্ত্র, বিজ্ঞান কোন কিছু দিয়েই
দুর্নীতি দমন সম্ভব হলো না। প্রতিটি অঙ্গ রাজ্যের রাস্তা গুলো গেল ভেঙ্গে, গেলদালানকোঠা
গুলো ভেঙে পড়তে ভূমিকম্প বা বড় ধরনের সাইক্লোন এর প্রয়োজন পড়লোনা, প্রত্যেক অঙ্গরাজ্যেই অর্থের বিনিময়ে অথবা বিশেষ যোগাযোগ মারফত সরকারি কর্মচারী কর্মকর্তা নিযুক্ত
হল। নবনিযুক্ত যারা স্থলাভিষিক্ত হলো তারা
পূর্বেকার সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে দুর্নীতির ঘন দধিকে আরো দানাদার রসমালাই রূপ দিতে পারলেন।
সে দেশের রাজা পড়লেন মহাবিপাকে ।সমস্যা সমাধানে বিস্তর রিসার্চ হল, পেট
মোটা মোটা সব ম্যাগাজিন বের হলো, সমস্যা সমাধান
কল্পে একাধিক কমিটি, উপ কমিটি, সাব-কমিটি গঠিত হলো। কিভাবে দুর্নীতি রোধ করা যায় তা
নিয়ে লিখিত লিফলেট , ব্রশিউর,প্যামপ্লেট, ফেস্টুন পোস্টারে দেশ ভরে গেল। দেশের সকল লোক মিলে
মিছিল বের করল, সকলে এক স্লোগান দিল দুর্নীতির আস্তানা এদেশে থাকবে না। মিছিল হল মিটিং
হল সভা-সমাবেশও হলো বিস্তর। সাথে সাথে বাজলো
বাঁশি, শঙ্খ, সানাই, ভেঁপু, শিঙ্গা,
কাঁসর, করতাল, মন্দিরা, ঘন্টা, খঞ্জনী ঢাক, ঢোল, জয়ঢাক, মাদল, মৃদঙ্গ, খোল, ডুগি ইত্যাদি
যত বাদ্যযন্ত্র আছে সবই।
কিন্তু একই বাজনার তালে তালে দুর্নীতি যেন আরো বেগ পেল, সেই সুর যেন হয়ে
গেল অসুর।এক গোপন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে জানা গেল প্রথম অঙ্গরাজ্যের ঈমানদার ব্যক্তির
যে কালোটাকা জমেছে তার সঠিক নিকেশ রাখা মানুষের দ্বারা সম্ভব হবেনা ফেরেশতা নিয়োগ
করতে হবে। দ্বিতীয় অঙ্গরাজ্যের
বাউল ব্যক্তির দুর্নীতি তাহার শরীরের অষ্টমকামে গজিয়ে উঠা পশমের সংখ্যায় বেড়ে উঠলো।
তৃতীয় অঙ্গরাজ্যের কর্ণধারের ঈশ্বর ও ধর্মে বিশ্বাস নাই ব্যক্তিরদুর্নীতি তাহার গুম্ফের ন্যায় শক্তপোক্ত সংখ্যাধিক হয়ে
বেড়ে উঠলো। যে অঙ্গরাজ্যের কর্ণধার স্বয়ং একজন ব্রাহ্মণ তার কৃষ্ণ টাকার পরিমান ভগবান
শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত গোপী, সখা, পূজক সংখ্যা ছাড়িয়ে গেল।
পাঁচটি অঙ্গরাজ্যের কর্ণধারদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা কে বেশি দুর্নীতি পরায়ন
তা নির্ণয় করার জন্য বিতর্ক সভার আয়োজন করা যেতে পারে কিন্তু সমাধান পাওয়া যাবে
বলে আশা করা দুরূহ ব্যাপার,তাই সকল গভর্নর
নিজের সমর্থকদের সাথে নিয়ে অন্যদেরকে ও হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য( আপহাত জগন্নাথ, পরহাত ইতরপাত” তাই) প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে শলাকা হাতে উঠে পড়ে লাগলো। সবাই বল্ল হাম বড়া।
রাজা পড়লেন মহাবিপাকে তিনি রাতভোর অনেক ভেবে চিন্তে দুর্নীতি মুক্তির অভিপ্রায়ে
একজন পরামর্শক কে পাঁচটি অঙ্গরাজ্যের পাঁচজন গভর্নরের কাছে কুরআন কিতাব ভগবত গীতা মানবতা
দর্শন বিজ্ঞান ইত্যকার নানা বিধ পুস্তকের বর্ণিত নীতিবাক্য নীতি দর্শন প্রচারের জন্য প্রেরণ করলেন। তিনি সাধ্যমত সকলকে বোঝালেন, শোনালেন।সকল গভর্নর পরামর্শকের উপদেশ গভীর আগ্রহ সহকারে শুনলেন ও বুঝলেন। কিন্তু দিন
যেতে না যেতেই প্রত্যেক প্রদেশেই দুর্নীতি বেড়ে গেল আরো দ্বিগুণ। এবার রাজা আবারো ভেবেচিন্তে প্রত্যেক অঙ্গরাজ্যে তিনজন করে পরামর্শক পাঠালেন এবংতিনে মিলে পাঁচ অঙ্গ
রাজ্যের গভর্নর দের দুর্নীতির পথে না হাটতে পাঁখপড়া পড়ালেন।তাতেও ফলোদয় হলো না দুর্নীতি বেড়ে গেল আরো
বিশ গুণ।
রাজা কিন্তু নাছড়বান্দা। তিনি দেশ থেকে দুর্নীতি মুক্ত করেই ছাড়বেন। তিনি
প্রথমে ডেকে পাঠালেন প্রথমে অঙ্গরাজ্যের গভর্নর কে,তিনি দুর্নীতির দায় স্বীকার করে বললেন, ভুল করার পর যে ব্যাক্তি পুনরায় ফিরে আসে তাঁকে রব্বুল আলামিন সবচাইতে বেশি ভালো বাসেন। গভর্নের উত্তর শুনে রাজ গৃহের বাতাসে তখন ঠাস ঠাস করে শব্দ ভেসে এল ।ধুমধাম ধড়াম ফড়াম শব্দ শোনা গেল। সঙ্গে সঙ্গে রাজার দরজা বন্ধ হয়ে
গেছে। রাজার মুখ থেকে সেই গৃহের মধ্যে কিছু ইতর প্রাণী যেমন শুকুর কুকুর ইত্যকার শাবকের নাম ধাম স্বশব্দে শোনা গেল।চাবুকের
শব্দ শোনা গেল হিস হিস। কিছু ডান্ডার ধাড়াম ধড়াম। সাধু বললেন, মহারাজ রজঃশীলা নারী, বহতা নদী, ও সাধুর কোন ভুল থাকতে পারেনা এটা সনাতন বিশ্বাস। মহারাজ একথা শুনে প্রথম গভর্ণরের শাস্তি সমেত দ্বিতীয় ও তৃতীয় গভর্নরের অষ্ট
মোকামে যত পশম আছে সব প্লাস নামক একটা যন্ত্র দিয়ে পরিচ্ছন্ন করে দিলেন।চতুর্থ ও পঞ্চম
গভর্নরের একই দাওয়ায় দেওয়া হলো। রাজার মুখে যে সব জিনিস পত্রের নাম শোনাগেল এবং তিনি
সেগুলকে যেসব পথে প্রবিষ্ট করাতে চাইছিলেন
তা কোন কোন ক্ষেত্রে প্রবেশ করানো কস্মিনকালেও সম্ভব নয়,আংশিক সম্ভব এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অসম্ভব কষ্টকর।
পরেরদিন ঐ কথিত দেশে সকালে সর্বাঙ্গসুন্দর একটা সূর্য উদিত হলো।সকল অঙ্গরাজ্যে ঘড়ির কাঁটা ধরে অফিসারগণ কার্যালয়ে হাজির হলেন। দেশের সকল রাস্তা কদিনেই ঝা-চকচকে হয়ে উঠলো। দুশো বছর পরেও নাকি সেই দেশে কোন মেয়াদউত্তীর্ণ দালান ক্রেন দিয়ে ভাঙ্গতে হয়েছে। ফাঁকিবাজী নামক শব্দটি সেই দেশের অভিধান থেকে কেটে দেওয়া হয়েছে।
যাইহোক ঐ পাঁচটি অঙ্গরাজ্যের রাতারাতি এ-ই পরিবর্তনের কারন জানার জন্যে সাংবাদিক বৃন্দের অশেষ আগ্রহ জন্মিলো। সাংবাদিক বৃন্দ প্রথম অঙ্গরাজের কর্ণধারকে জিজ্ঞস করলেন তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আদাব কালামান্তে বললেন সবই রবের ইচ্ছা। দ্বিতীয় জন বললেন আসলে এসব ভালোকিছু সবই কুসংস্কার মুক্ত মানবতাবাদের ফল,সাধু বললেন জয় গুরু।ব্রাহ্মণ বললেন ঔম তত সৎ ।
কিন্তু কথিত আছে ঐ পাঁচজন কর্ণধার নিজ গৃহেও নকি আজীবন পাজামা, ধুতি বা প্যাণ্ট খুলেন নাই।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন